This website is under development. Some features and content may not be fully available yet. Thank you for your patience and support.
রমাদান ধারাবাহিক | পর্ব ২৬
যাকাত: নিসাব, হকদার ও গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা — যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা প্রয়োজন
RAMADAN
3/15/20261 min read
যাকাত: নিসাব, হকদার ও গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা — যা প্রত্যেক মুসলিমের জানা প্রয়োজন
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।
যাকাতএটি শুধু একটি আর্থিক ইবাদত নয়, বরং সম্পদকে পবিত্র করা এবং সমাজে দরিদ্র ও অভাবীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার একটি মহান ব্যবস্থা। আল্লাহ তাআলা কুরআনে বহু স্থানে সালাতের সাথে যাকাতের কথা উল্লেখ করেছেন, যা এর গুরুত্ব স্পষ্ট করে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনীদের সম্পদ পবিত্র হয় এবং সমাজের অসহায় মানুষের প্রয়োজন পূরণ হয়। তবে যাকাত প্রত্যেক মুসলিমের উপর ফরয নয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে এবং কিছু শর্ত পূরণ হলে তখনই যাকাত ফরয হয়।
এই নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদের সীমাকেই বলা হয় নিসাব।
নিসাব কী?
নিসাব হচ্ছে যাকাত ফরয হওয়ার সর্বনিম্ন সীমা। যদি কোনো ব্যক্তি এ পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তার ওপর যাকাত ফরয হবে। আর যদি এর চেয়ে কম পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তাহলে তার ওপর যাকাত ফরয হবে না।
যাকাতের নিসাব
১. স্বর্ণ: যদি কারো কাছে সর্বনিম্ন ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ থাকে, তাহলে তার ওপর যাকাত ফরয হবে।
যাকাতের পরিমাণ: ২.৫% (হাজারে ২৫ ভাগ)।
২. রৌপ্য: যদি কারো কাছে সর্বনিম্ন ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্য থাকে, তাহলে তার ওপর যাকাত ফরয হবে।
যাকাতের পরিমাণ: ২.৫%।
৩. নগদ অর্থ: যদি কারো কাছে ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্যের মূল্যমানের সমপরিমাণ নগদ অর্থ থাকে—চাই তা নিজের কাছে জমা থাকুক অথবা ব্যাংকে সংরক্ষিত থাকুক—তাহলে তাতে যাকাত দিতে হবে।
বর্তমানে স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূল্যের মধ্যে বেশ পার্থক্য রয়েছে। তাই সতর্কতার জন্য এবং গরিবদের কল্যাণের কথা বিবেচনা করে রৌপ্যের নিসাব অনুযায়ী যাকাত হিসাব করা উত্তম। যদি আপনার সঞ্চিত অর্থ এক চন্দ্র বছর (৩৫৪ দিন) পূর্ণ করে এবং তা রৌপ্যের নিসাবের সমান বা বেশি হয়, তাহলে সেই অর্থের ২.৫% যাকাত আদায় করতে হবে।
যাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে:
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে যাকাত বণ্টনের জন্য ৮টি খাত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এই ৮ শ্রেণির লোক ছাড়া অন্য কাউকে যাকাত দিলে তা আদায় হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন—
إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَاِبْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنْ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ
‘যাকাত তো কেবল ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ করা প্রয়োজন (নওমুসলিম), দাস মুক্তির জন্য, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে (জিহাদে বা দ্বীনি ইলম অর্জনে) এবং মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৬০)
এই ৮ শ্রেণি হলো:
যাদেরকে যাকাত দেওয়া যাবে (৮ শ্রেণি)
১. ফকির: যার (মুসলিম) কাছে কিছুই নেই বা জীবিকা নির্বাহের কোনো উপায় নেই; অত্যন্ত নিঃস্ব ব্যক্তি।
২. মিসকিন: যার (মুসলিম) কিছু সম্পদ আছে, কিন্তু তা দিয়ে তার সংসার চলে না বা মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় না।
৩. আমিল (যাকাত সংগ্রহকারী): যে ব্যক্তি ইসলামী রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যাকাত ও উশর সংগ্রহের জন্য নিয়োজিত থাকে। তাকেও যাকাত দেওয়া যেতে পারে।
(তবে বর্তমানে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা না থাকায় এর প্রচলন খুব কম।)
৪. মুয়াল্লাফাতুল কুলুব: এমন ব্যক্তি যাদের অন্তর ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য বা ইসলাম গ্রহণের পর তাদের হৃদয় দৃঢ় করার উদ্দেশ্যে যাকাত দেওয়া হয়। সাধারণত নতুন মুসলিম বা ইসলামের প্রতি আগ্রহী ব্যক্তিরা এর অন্তর্ভুক্ত।
কিছু আলেমের মতে বর্তমানে এর প্রয়োজন কমে গেছে, তবে অন্য অনেক আলেমের মতে প্রয়োজনে এ খাত এখনো প্রযোজ্য।
৫. দাসমুক্তি: দাস বা বন্দিকে মুক্ত করার জন্য যাকাত দেওয়া।
(বর্তমানে দাসপ্রথা প্রায় বিলুপ্ত হওয়ায় এর ব্যবহার নেই।)
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যে ব্যক্তি (মুসলিম) বৈধ কারণে ঋণে জর্জরিত এবং ঋণ পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ নেই।
৭. ফি সাবিলিল্লাহ (আল্লাহর পথে): আল্লাহর পথে জিহাদ বা দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ব্যক্তি বা দ্বীনি ইলম অর্জনকারী দরিদ্র শিক্ষার্থী।
৮. মুসাফির: সফরের সময় যার অর্থ শেষ হয়ে গেছে। যদিও তার নিজ দেশে সম্পদ থাকতে পারে, তবুও সফরের প্রয়োজনে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে
যেসব সম্পদের ওপর যাকাত ফরয
১. স্বর্ণ ও রৌপ্য
২. নগদ অর্থ ও সঞ্চয়
৩. ব্যবসায়িক পণ্য
৫. জমিন থেকে উৎপাদিত রবিশষ্য (যেগুলো শুকিয়ে সংরক্ষণযোগ্য) যেমন, ধান, গম, শরিসা, ভু্ট্টা ইত্যাদি অথবা ফলফলাদি (যেগুলো শুকিয়ে সংরক্ষণযোগ্য), যেমন খেজুর, কিশমিশ ইত্যাদি।৬. গবাদী পশু (নির্দিষ্ট পরিমান সাপেক্ষে)
যে সকল জিনিসে যাকাত নেই:
১.বসবাসের জন্য বসত ভিটা, ঘর-বাড়ি, ফসলের জায়গা-জমি, বাড়ির ব্যবহারিক আসবাবপত্র, ব্যবহারের জন্য গাড়ি, ভাড়ার জন্য বাস, ট্রাক, লঞ্চ ইত্যাদি পরিবহন, ভাড়ার জন্য তৈরিকৃত আবাসিক বিল্ডিং বা দোকান, নিজস্ব দোকান, দোকানের জায়গা ও ফার্নিচার (তবে দোকানের পণ্যের যাকাত দিতে হবে) ইত্যাদি।
২. পুকুরের মাছেও যাকাত নেই। তবে মাছ বিক্রয়ের অর্থ যদি নিসাব পরিমান হয় তাহলে তাতে যাকাত দিতে হবে।
৩. কাঁচামাল-যেমন, শাক-সবজি, আম, কাঠাল, লিচু ইত্যাদি ফলমূলে যাকাত নেই। তবে এগুলো বিক্রয়ের অর্থ নিসাব পরিমান হলে তাতে যাকাত দিতে হবে।
৪. অনুরূপভাবে দোকান, আবাসিক বিল্ডিং, বাস-ট্রাক ইত্যাদিতে যাকাত নাই। কিন্তু এগুলো থেকে প্রাপ্ত ভাড়া নিজের অন্যান্য অর্থের সাথে যুক্ত করে নিসাব পরিমান হলে যাকাত বের করতে হবে।
৫. জায়গা-জমি, গবাদী পশু ও বিল্ডিং ইত্যাদি ক্রয়-বিক্রয় করলে সেগুলো ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে যাকাত দিতে হবে।
যাকাত সম্পর্কে এখানে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো। কাকে যাকাত দেওয়া যাবে এবং কাকে দেওয়া যাবে না—এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য নির্ভরযোগ্য আলেমদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া উচিত।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন আমাদেরকে আমাদের সম্পদের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করেন। আমাদের নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর আল্লাহর রহমত ও শান্তি বর্ষিত হোক।
