This website is under development. Some features and content may not be fully available yet. Thank you for your patience and support.

রমাদান ধারাবাহিক | পর্ব ২৩

কুরআন তিলাওয়াতের দ্বিতীয় প্রকার: হুকমী বা প্রায়োগিক তিলাওয়াত

RAMADAN

3/13/20261 min read

কুরআন তিলাওয়াতের দ্বিতীয় প্রকার: হুকমী বা প্রায়োগিক তিলাওয়াত

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।

পূর্বের আলোচনায় আমরা জানেছি, আল্লাহর কিতাবের তিলাওয়াত দুই প্রকার—
১) শাব্দিক তিলাওয়াত (কুরআন পাঠ করা),
২) হুকমী বা প্রায়োগিক তিলাওয়াত । এটা হলো আল্লাহর কথাকে বিশ্বাস করা, তাঁর নির্দেশ মেনে নিয়ে তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ থেকে বর্জন করে কিতাব তথা আল কুরআনের সকল হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করা।

হুকমী বা প্রায়োগিক তিলাওয়াত হলো কুরআনের নাযিলের বৃহত্তম লক্ষ্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

“আমরা আপনার প্রতি নাযিল করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।” — সূরা সোয়াদ, আয়াত: ২৯

এ জন্য সালাফে সালেহীন রহ. কুরআন তিলাওয়াতের এ পদ্ধতির উপর চলে কুরআন শিক্ষা করেছেন, এর উপর বিশ্বাস স্থাপন করেছেন এবং মজবুত আক্বীদা-বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে এর যাবতীয় বিধানাবলিকে ইতিবাচক ধারায় বাস্তবায়িত করেছেন।

আবূ আব্দুর রহমান আসসুলামী রহ. বলেন: ‘উসমান ইবন আফ্ফান, আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ প্রমুখ যারা আমাদেরকে কুরআন শিক্ষা দিতেন তারা বলেছেন, তারা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দশটি আয়াত শিখতেন, যতক্ষণ পর্যন্ত তা ভালোভাবে না শিখতেন ও তাতে যে সকল জ্ঞান ও আমল করার কথা রয়েছে তা বাস্তবায়ণ না করতেন ততক্ষণ পর্যন্ত সামনে অগ্রসর হতেন না। তারা বলেন, আমরা এভাবেই কুরআন, জ্ঞান ও আমল সবই শিখেছি।” তাফসীর ইবন জারীর আত-ত্বাবারী: ১/৮০; ইবন তাইমিয়া, মাজমূ‘ ফাতাওয়া: ৭/১৬৮।

আর এটাই হলো কুরআন তিলাওয়াতের ওই প্রকার যার ওপর সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য নির্ভর করে।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘অতঃপর যখন তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে, তখন যে আমার হিদায়াতের অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না এবং দুর্ভাগাও হবে না। আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে নিশ্চয় এক সংকুচিত জীবন এবং আমি তাকে কিয়ামত দিবসে উঠাবো অন্ধ অবস্থায়। সে বলবে, ‘হে আমার রব, কেন আপনি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালেন? অথচ আমি তো ছিলাম দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন? তিনি বলবেন, ‘এমনিভাবেই তোমার নিকট আমার নিদর্শনাবলি এসেছিল, কিন্তু তুমি তা ভুলে গিয়েছিলে এবং সেভাবেই আজ তোমাকে ভুলে যাওয়া হল। আর এভাবেই আমি প্রতিফল দান করি তাকে, যে বাড়াবাড়ি করে এবং তার রবের নিদর্শনাবলিতে ঈমান আনে না। আর আখিরাতের আযাব তো অবশ্যই কঠোরতর ও অধিকতর স্থায়ী।’ সূরা ত্ব-হা: ১২৩-১২৭

‘অতঃপর যখন তোমাদের কাছে আমার পক্ষ থেকে হিদায়াত আসবে," সেই মহান হেদায়াত হলো, আল-কুরআন।

হেদায়াত অনুসারীদের বড় প্রাপ্তি হল তারা পথভ্রষ্ট হবে না ও দুর্ভাগা হবে না। তাদের থেকে ভ্রষ্টতা ও দুর্ভাগ্য দূর করার অর্থ হচ্ছে তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্য ও পূর্ণ হেদায়াত সাব্যস্ত করা।

পক্ষান্তরে হেদায়াত বিমুখদের শাস্তি হল, দুনিয়া ও আখেরাতে তারা দুর্ভাগা ও হতভাগা হওয়া। তাদের জীবন হবে খুবই সংকীর্ণ। সে দুনিয়াতে: দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতা তথা সমস্যা সঙ্কুল অবস্থায় থাকবে। তার কোনো বিশুদ্ধ আকীদা নেই, নেই কোনো সৎ আমল।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত; বরং তারা অধিক পথভ্রষ্ট। তারাই হচ্ছে গাফেল।’ সূরা আল-‘আরাফ, আয়াত: ১৭৯

আর সে কবরে: থাকবে সংকীর্ণ অবস্থায়। তার কবর হবে সংকুচিত। এমনকি তার এক পাঁজরের হাড় অন্য পাঁজরে মিলে যাবে। আর সে হাশরের দিন হবে অন্ধ, ফলে কিছুই দেখতে পাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

‘আর আমি কিয়ামতের দিনে তাদেরকে একত্র করব উপুড় করে, অন্ধ, মূক ও বধির অবস্থায়। তাদের আশ্রয়স্থল জাহান্নাম; যখনই তা নিস্তেজ হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুন বাড়িয়ে দেব।’ সূরা বানী ইসরাঈল, আয়াত: ৯৭

তারা যেহেতু দুনিয়াতে সত্যের ব্যাপারে অন্ধ, সত্য শ্রবণ থেকে বধির ও সত্য বলা থেকে বিরত ছিল, আর তারা বলত:

‘আপনি আমাদেরকে যার প্রতি আহ্বান করছেন সে বিষয়ে আমাদের অন্তরসমূহ আচ্ছাদিত, আমাদের কানের মধ্যে রয়েছে বধিরতা আর আপনার ও আমাদের মধ্যে রয়েছে অন্তরায়।’ সূরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৫

তাই আল্লাহ তা‘আলা আখিরাতে তাদেরকে সেরূপ প্রতিদানই দেবেন যেরূপ তারা দুনিয়াতে করেছিল। আর আল্লাহ তাদেরকে ওইভাবে ধ্বংস করবেন, যেভাবে তারা আল্লাহর শরীয়তকে ধ্বংস করেছে।

কুরআনের সঙ্গে অবহেলা করলে পরিণতি

সহীহ বুখারীতে সামুরা ইবন জুনদুব রা: থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা:) যখন কোনো সালাত আদায় করতেন (অন্য বর্ণনায় এসেছে, যখন ফজরের সালাত আদায় করতেন) তখন তিনি আমাদের দিকে মুখ করে বসতেন এবং জিজ্ঞাসা করতেন, ‘তোমাদের কেউ কি আজ রাতে কোনো স্বপ্ন দেখেছ? বর্ণনাকারী বলেন, যদি কেউ দেখত তাহলে বর্ণনা করত। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, মাশাআল্লাহ। এরূপ তিনি একদিন আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের মধ্যে কেউ কি আজ রাতে কোনো স্বপ্ন দেখেছ? আমরা বললাম না। তখন তিনি বললেন, আজ রাতে আমি স্বপ্ন দেখলাম, দু’জন লোক আমার নিকট এল (তারপর তিনি দুই ব্যক্তির বিবরণ দিলেন অতঃপর হাদীসে এসেছে), আমরা চলতে চলতে একজন শায়িত ব্যক্তির কাছে পৌঁছলাম, সেখানে এক ব্যক্তিকে পাথর হাতে তার শিয়রে দাঁড়ানো দেখতে পেলাম। যখন সে ওই পাথরটি শায়িত ব্যক্তির মাথায় নিক্ষেপ করে, তখন পাথরটি তার মাথা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দূরে ছিটকে যায়। পুনরায় পাথরটি নিয়ে আসার পূর্বেই তার মাথাটি আবার পূর্বের ন্যায় হয়ে যায়। অতঃপর সে তার নিকট ফিরে এসে পূর্বের ন্যায় একই আচরণ করে। আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, এটা কী? তারা দু’জন বলল, সামনে অগ্রসর হোন। (তিনি হাদীসটি বর্ণনা করলেন, তাতে রয়েছে) যে লোকটির নিকট আমি এসেছিলাম এং যার মাথা পাথর দিয়ে চূর্ণ-বিচূর্ণ করা হচ্ছিল, সে কুরআন শিক্ষা করেছে, অথচ সে অনুযায়ী আমল করে নি। আর সে ফরয সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে যেতো।’ বুখারী: ১৩৮৬

‘আমর ইবন শু‘আইব তার বাবা থেকে, তার বাবা তার দাদা থেকে বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ বলেছেন: ‘কিয়ামতের দিন কুরআনকে এক ব্যক্তির আকার দেয়া হবে। অতঃপর একজন লোকের সামনে তাকে উপস্থিত করা হবে। সে কুরআন বহণ করেছিল ও তার নির্দেশ লঙ্ঘন করেছিল। তখন কুরআনকে তার বিরুদ্ধে বাদী হিসেবে দাঁড় করানো হবে। তখন কুরআন বলবে, হে আমার প্রভু! আপনি তাকে আমার বহনকারী বনিয়েছিলেন, অথচ সে কতইনা নিকৃষ্ট বহনকারী ছিল। সে আমার সীমালঙ্ঘন করেছে, আমার ফরযসমূহ নষ্ট করেছে ও আমার নাফরমানি করেছে এবং আনুগত্য পরিত্যাগ করেছে। কুরআন অনবরত তার রিরুদ্ধে প্রমাণ পেশ করে তাকে লাঞ্ছিত করতেই থাকবে। পরিশেষে তাকে বলা হবে, তোমার ব্যাপারে কুরআনের এ অভিযোগ। তখন কুরআন তাকে আপন হাতে ধরে নিয়ে অধঃমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে।’ইবন আবী শায়বা

সহীহ মুসলিমে আবূ মালেক আশআরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,‘কুরআন তোমার পক্ষে অথবা বিপক্ষে দলীল হবে।’ মুসলিম: ২২৩

অনুরূপ ‘আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেন, ‘কুরআন এমন সুপারিশকারী যার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। যে ব্যক্তি কুরআনকে সম্মুখে রাখবে, কুরআন তাকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে। আর যে কুরআনকে পেছনে রাখবে, কুরআন তাকে তাড়িয়ে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাবে।’ ইবন আবী শায়বা

সুতরাং হে ব্যক্তি! কুরআন যার বিপক্ষে বাদী হিসাবে দাঁড়াবে, কিভাবে তুমি তোমার পক্ষে তার সুপারিশের আশা কর? ওই লোকের জন্য আফসোস! যার সুপারিশকারী বিচার দিবসে তার বিপক্ষে বাদী হয়ে যাবে।