This website is under development. Some features and content may not be fully available yet. Thank you for your patience and support.

রমাদান ধারাবাহিক | পর্ব ২১

রমাদান ও কুরআনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

RAMADAN

3/11/20261 min read

রমাদান ও কুরআনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।

রমাদানের সাথে কুরআনের রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। মানবজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্বল মহাগ্রন্থ আল-কুরআন আল্লাহ তা‘আলা রমাদান মাসেই নাযিল করেছেন। কুরআন কারীমে ইরশাদ হয়েছে—

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْ أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِلنَّاسِ وَبَيِّنَاتٍ مِّنَ الْهُدَىٰ وَالْفُرْقَانِ

“রমাদান মাস; যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে—মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং সঠিক পথের সুস্পষ্ট নিদর্শন ও (সত্য-মিথ্যার মধ্যে) ফয়সালাকারী।”
— সূরা আল-বাকারা: ১৮৫

পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হওয়ার ধাপসমূহ

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনকে অত্যন্ত সম্মান ও মর্যাদার সাথে অবতীর্ণ করেছেন। তাই কুরআনের অবতরণের প্রক্রিয়াটিও ছিল বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ। আলেমগণের ব্যাখ্যা অনুযায়ী পবিত্র কুরআন তিনটি ধাপে অবতীর্ণ হয়েছে।

প্রথম ধাপ: কুরআন সংরক্ষিত ছিল লাওহে মাহফূযে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَّجِيدٌ ۝ فِي لَوْحٍ مَّحْفُوظٍ

“বরং এটি মহিমান্বিত কুরআন, যা সংরক্ষিত রয়েছে লাওহে মাহফূযে।”— সূরা আল-বুরুজ: ২১–২২

দ্বিতীয় ধাপ: এরপর সম্পূর্ণ কুরআন একসাথে অবতীর্ণ করা হয় বাইতুল ‘ইজ্জাহ-তে, যা দুনিয়ার আসমানে (প্রথম আসমান)। এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

“নিশ্চয়ই আমরা এটি লাইলাতুল কদরের রাতে নাযিল করেছি।” — সূরা আল-কদর: ১

তৃতীয় ধাপ: এরপর ফেরেশতা জিবরাঈল ‘আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে বিভিন্ন ঘটনা ও প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর ওপর কুরআন অবতীর্ণ হতে থাকে প্রায় তেইশ বছরে।

এ সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ ۝ عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ

বিশ্বস্ত আত্মা (জিবরাঈল) একে নিয়ে অবতরণ করেছে । তোমার হৃদয়ে, যাতে তুমি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হও।
— সূরা আশ-শু‘আরা: ১৯৩–১৯৪

ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ও অন্যান্য আলেমগণ বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা প্রথমে সম্পূর্ণ কুরআনকে লাওহে মাহফুজ থেকে একবারে বাইতুল ‘ইজ্জাহ-তে (যা প্রথম আসমানে অবস্থিত) অবতীর্ণ করেন। এরপর ঘটনাবলী ও প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে প্রায় তেইশ বছরে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপর তা নাযিল করা হয়। — তাফসীর ইবন কাসীর, সূরা আল-কদর: ১

কুরআন: মুমিনের জীবনের আলো

পবিত্র কুরআন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উম্মতের প্রতি আল্লাহ তাআলার একটি বিশেষ নিআমত। কুরআন এমন আলো, এমন পাথেয় ও সম্বল, এমন সঙ্গী ও পথনির্দেশক, যার অনুগামী না হলে বান্দা পথ হারাবেই, যা সাথে না রাখলে মুমিন নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো চলতে থাকবে। কুরআন আমাদের শেখায় কীভাবে কথা বলতে হবে, কীভাবে আচরণ করতে হবে, অন্যদের সাথে কেমন ব্যবহার করতে হবে, আমাদের নৈতিকতা, সম্পর্ক, লেনদেন — আল্লাহ্‌ ﷻ-কে খুশি করা, সওয়াব অর্জন করা এবং দুনিয়া ও আখেরাতে সফল হওয়ার জন্য যা কিছু দরকার, সবই কুরআনে রয়েছে। কেন আমরা কুরআন পড়ব?

হিদায়াত পাওয়ার জন্য

কুরআন মানুষের জন্য সঠিক পথের দিশা দেখায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন—

ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ فِيهِ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ

“এ সেই কিতাব, এতে কোনো সন্দেহ নেই; এটি মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” — সূরা আল-বাকারা: ২

কুরআন মানুষের জন্য সঠিক পথের দিশা দেখায়। মানবজীবনের নানা সমস্যা ও সংকটের সমাধান রয়েছে এই মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে। তাই প্রকৃত হিদায়াত লাভ করতে এবং জীবনের সঠিক দিকনির্দেশনা পেতে হলে কুরআন শুধু তিলাওয়াত করলেই হবে না, বরং তা বুঝে পড়া ও জীবনে বাস্তবায়ন করা জরুরি।

নেকি ও সাওয়াব অর্জনের জন্য

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

‘যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, সালাত কায়েম করে, আমার দেয়া রিযিক থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করতে পারে এমন ব্যবসার, যা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হবেনা, কারণ আল্লাহ তাদের কর্মের পূর্ণ প্রতিদান দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরো অধিক দান করবেন। তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ সূরা আল-ফাতির:২৯-৩০

কুরআনের প্রতিটি অক্ষর পড়ার জন্য নেকি পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করবে, তার জন্য একটি নেকি হবে, আর প্রতিটি নেকি দশগুণ বৃদ্ধি করা হবে।”
তিরমিযী

কিয়ামতের দিন সুপারিশ পাওয়ার জন্য

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন— “তোমরা কুরআন পাঠ করো; কারণ কিয়ামতের দিন এটি তার পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আসবে।” — সহীহ মুসলিম

রমাদানে কুরআন তিলাওয়াতের গুরুত্ব

রমাদান মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা এবং পুরো কুরআন খতম করার চেষ্টা করা একজন মুসলিমের জন্য অত্যন্ত উত্তম ও প্রশংসনীয় আমল। তবে কুরআন খতম করা ফরয বা বাধ্যতামূলক নয়। তাই কেউ যদি কোনো কারণে পুরো কুরআন খতম করতে না পারে, তাহলে সে গুনাহগার হবে না। কিন্তু সে অবশ্যই অনেক বড় সাওয়াব থেকে বঞ্চিত হবে। এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাদীস রয়েছে। আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন—

প্রতি রামাযানে জিব্রীল (আঃ) একবার কুরআন শুনাতেন। আর যে বছরে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইন্তেকাল করেন, সে বছর দু’বার কুরআন শুনান।” — সহীহ বুখারী:

রমাদান মাসকে সালাফে সালেহীন (রহ.) কুরআনের মাস হিসেবে গ্রহণ করতেন। তারা এই মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং কুরআন খতম করার জন্য বিশেষ চেষ্টা করতেন। সালাফদের জীবন থেকে এ বিষয়ে অনেক দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়—

ইবরাহিম আন-নাখাঈ (রহ.) বলেন,
আল-আসওয়াদ (রহ.) রমাদানে প্রতি দুই রাতে একবার কুরআন খতম করতেন।
সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা: ৪/৫১

কাতাদা (রহ.) সাধারণ সময়ে সাত দিনে কুরআন খতম করতেন। কিন্তু রমাদান এলে তিনি তিন দিনে একবার খতম করতেন। আর রমাদানের শেষ দশকে প্রতি রাতে একবার কুরআন খতম করতেন।
সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা: ৫/২৭৬

মুজাহিদ (রহ.) সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তিনি রমাদানে প্রতি রাতে কুরআন খতম করতেন।
আত-তিবইয়ান, ইমাম নববী, পৃ. ৭৪

আরও বর্ণিত হয়েছে যে, আলী আল-আযদী (রহ.) রমাদানে প্রতি রাতে কুরআন খতম করতেন।
তাহযীবুল কামাল: ২/৯৮৩

ইমাম শাফি‘ঈ (রহ.) রমাদান মাসে ষাটবার কুরআন খতম করতেন।
সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা: ১০/৩৬

আল-কাসিম ইবন আল-হাফিয ইবন আসাকির (রহ.) বলেন,
আমার পিতা নিয়মিত জামাতে সালাত আদায় করতেন এবং কুরআন তিলাওয়াত করতেন। তিনি সাধারণ সময়ে প্রতি সপ্তাহে একবার কুরআন খতম করতেন, আর রমাদানে প্রতিদিন একবার খতম করতেন।
সিয়ার আ‘লাম আন-নুবালা: ২০/৫৬২

ইমাম নববী (রহ.) বলেন, কুরআন কত দিনে খতম করা উত্তম—এটি মানুষের অবস্থা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। যে ব্যক্তি কুরআনের অর্থ বুঝতে ও তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে চায়, তার উচিত ততটুকু পড়া যতটুকু সে ভালোভাবে বুঝতে পারে। আর যে ব্যক্তি জ্ঞান প্রচার বা মুসলিম সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত, তার উচিত এমন পরিমাণ তিলাওয়াত করা যাতে তার দায়িত্ব পালনে ব্যাঘাত না ঘটে। আর যদি কেউ এ ধরনের কাজে ব্যস্ত না থাকে, তবে সে যেন অধিক পরিমাণে কুরআন তিলাওয়াত করে, তবে এমন পর্যায়ে না পৌঁছায় যাতে বিরক্তি বা ক্লান্তি চলে আসে। — আত-তিবইয়ান, পৃ. ৭৬

এই হাদীস থেকে বোঝা যায় যে, রমাদান মাসে কুরআনের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা—তিলাওয়াত, অধ্যয়ন এবং পুনরাবৃত্তি করা—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।

কুরআন শিক্ষার প্রতি আমাদের দায়িত্ব

আজ আমরা লেখাপড়া শিখে দুনিয়াবি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজেকে অনেক বড় মনে করি। বাসায় বা কর্মক্ষেত্রে যে আমার অধিনে কাজ করে মনে করি তার চেয়ে আমি উত্তম। আপনি কি জানের সত্যিকারের উত্তম ব্যক্তি কে?

রসুলুল্লাহ (সা:) বলেছেন:

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি যিনি কুরআন মাজীদ শিক্ষা করেন এবং অন্যকে শিক্ষা দেন।”[ বুখারী: ৫০২৭]

সুতারাং আল্লাহর দৃষ্টিতে উত্তম ব্যক্তি হলো যে কোরআন শিখতে ও শিখাতে সচেষ্ট। সুতারাং আপনি আপনার অধিনস্থ ব্যক্তীর চেয়ে উত্তম (বেস্ট) হতে পারেন যদি আপনি কোরআন জানেন। অন্তত পক্ষে কোরআন পড়তে পারেন। তা না হলে আপনি আসলেই নিরক্ষর, যার কোন অক্ষর জ্ঞান নাই, যে নিজের রবের কালামই পড়তে পারে না। অতএব অশিক্ষত।

আমাদের মধ্যে অনেক বাবা মারাই আছেন যারা নিজের সন্তানদের কোরআন শেখার ব্যাপরে অনেক সচেতন অথচ নিজেরা কোরআন শিক্ষা করার ব্যপারে আগ্রহি না। আমরা নিজেদের বাচ্চাদেরকে মসজিদে দিয়ে আসি বা বাসায় প্রাইভেট হুজুর রেখে দেই তার কোরআন শিক্ষা করার জন্য অথচ নিজেরাই কোরআন পড়তে জানি না। দিনের পর দিন যায় অথচ আমদের এই মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয় না। তাই আসুন এই রমাদানে আমরা সঠিকভাবে কোরআন শিক্ষা করার নিয়ত নেই। আজ ইন্টারনেটে যুগে যারা স্মার্ট ফোন ব্যবহার করি তারা সহজেই অনলাইনে কোরআন শিক্ষা করতে পারি। এরকম অনেক সাইট আছে, ভিডিও আছে যেখান থেকে কোরআন শিক্ষা করতে পারা যায়।

আসুন যারা আমরা কোরআন পড়তে পারি না তারা নিয়ত করি পরবর্তি রমাদান আসার আগে আমরা কোরআন পড়তে জানব ইনশাআল্লাহ।যদি না জানেন কোথা থেকে শুরু করবেন, কিভাবে শুরু করবেন - জানতে চাইলে খুশিমনে হেল্প করব বিইজনিল্লাহ।