This website is under development. Some features and content may not be fully available yet. Thank you for your patience and support.

রমাদান ধারাবাহিক | পর্ব ১৫

সিয়ামের ফরয আদবসমূহ – পর্ব ১

RAMADAN

Umm Ayman

3/5/20261 min read

সিয়ামের ফরয আদবসমূহ – পর্ব ১

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম।

আমাদের মনে রাখতে হবে—সিয়াম শুধু খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার নাম নয়। সিয়ামকে শুদ্ধ করার জন্য শরীরের প্রতিটি অঙ্গকে হারাম কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে।

চোখের সিয়াম — হারাম জিনিস না দেখা
কানের সিয়াম — গান, বাজনা ও বাজে কথা না শোনা
মুখের সিয়াম — মিথ্যা, গীবত, চুগলখোরি ও কটু কথা থেকে বিরত থাকা
হৃদয়ের সিয়াম — হিংসা ও বিদ্বেষ থেকে মুক্ত থাকা
হাতের সিয়াম — অন্যায় কাজে হাত ব্যবহার না করা
পায়ের সিয়াম — খারাপ জায়গায় না যাওয়া

জাবের রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন:

‘যখন তুমি সাওম রাখবে তোমার কর্ণ, চক্ষু, জিহ্বা ও যেন মিথ্যা কথা ও সব হারাম বর্জনের মাধ্যমে সাওম পালন করে। তুমি প্রতিবেশিকে কষ্ট দেয়া থেকে বিরত থাকো। অবশ্যই তুমি আত্মসম্মান ও প্রশান্তভাব বজায় রাখবে। আর তোমার সাওমের দিন ও সাওমবিহীন দিন যেন সমান না হয়।’ ---- ইবন রজব, লাতায়েফুল মা‘আরিফ, পৃ. ২৯২

সিয়ামের অনেক আদব বা পালনীয় বিষয় রয়েছে, যা ছাড়া সিয়াম পূর্ণতা পায় না। সিয়ামের আদবসমূহকে দুই প্রকারে ভাগ করা হয়েছে:
১. ফরয করণীয়সমূহ
২. মুস্তাহাব করণীয়সমূহ

ফরয করণীয়সমূহ হলো সেসব বিষয়, যা প্রতিটি সাওম পালনকারীকেই অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে এবং সেগুলো পালনের ক্ষেত্রে যথাযথ যত্নবান থাকতে হবে।

সালাত

ইসলামে সকল ইবাদতের মধ্যে ঈমানের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরয ইবাদত হলো সালাত। সালাত ইসলামের শ্রেষ্ঠতম ইবাদত, যা ঈমান ও কুফরের পার্থক্য নির্ধারণ করে।

ইসলামের অন্যান্য ইবাদতের ক্ষেত্রে কিছু বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও সালাতের কোনো বিকল্প নেই। যেমন—

  • অসুস্থ ব্যক্তি রোযা পরে কাযা করতে পারে

  • একেবারে অক্ষম ব্যক্তি ফিদইয়া দিতে পারে

  • কেউ জীবদ্দশায় হজ না করতে পারলে মৃত্যুর পর অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে হজ আদায় করতে পারে

কিন্তু সালাতের ক্ষেত্রে এরকম কোনো কাফ্‌ফারা বা বিকল্প ব্যবস্থা নেই। যতক্ষণ মানুষের হুঁশ বা চেতনা থাকবে, ততক্ষণ সালাত আদায় করতেই হবে। এজন্য আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সালাতকে আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কেউ দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে কিংবা ইশারার মাধ্যমে সালাত আদায় করতে পারে। প্রয়োজনে যোহর-আসর এবং মাগরিব-ইশা একত্রিত করেও পড়া যায়। কিন্তু কোনো ওয়াক্তের সালাত ছেড়ে দেওয়া বৈধ নয়।

রসূল (সা:) বলেছেন:

“ইচ্ছাপূর্বক এক ওয়াক্ত ফরয সালাতও পরিত্যাগ করবে না। কারণ যে ব্যক্তি ইচ্ছাপূর্বক এক ওয়াক্ত ফরয সালাত পরিত্যাগ করবে, সে আল্লাহর যিম্মা ও তাঁর রাসূলের যিম্মা থেকে বহিস্কৃত হবে।” [ইবনু মাজাহ, বাইহাকী, তাবারানী]

সুতারাং সলাতের রুকন ও ওয়াজিবসমূহ আদায় করা ও সময়মত জামাতের সঙ্গে মসজিদে গিয়ে সলাত আদায় করা অবশ্য কর্তব্য। কেননা এটা তাকওয়ার অন্তর্ভুক্ত, যা অর্জনের জন্য সিয়ামের বিধান প্রবর্তন করা হয়েছে এবং উম্মতের জন্য ফরয করা হয়েছে। আর সালাত পরিত্যাগ করা তাকওয়ার পরিপন্থী এবং শাস্তির আবশ্যককারী।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

‘তাদের পরে আসল এমন এক অসৎ বংশধর যারা সালাত বিনষ্ট করল এবং কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ করল। সুতরাং শীঘ্রই তারা জাহান্নামের শাস্তি প্রাপ্ত হবে। তবে তারা নয় যারা তাওবা করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে; তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি কোন যুলম করা হবে না।’ --সূরা মারইয়াম: ৫৯-৬০

মিথ্যা থেকে বেঁচে থাকা:

সবচেয়ে নিকৃষ্ট মিথ্যা হলো আল্লাহ তা‘আলা ও তাঁর রাসূল ﷺ-এর নামে মিথ্যা বলা। যেমন—কোনো হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল বলে আল্লাহর দিকে সম্পর্কযুক্ত করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

আর তোমাদের জিহবা দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম, আল্লাহর উপর মিথ্যা রটানোর জন্য। নিশ্চয় যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না। --সূরা আন-নাহল: ১১৬

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন তার স্থান জাহান্নামে নির্ধারণ করে নেয়।”---বুখারী: ১০৭

আরও বলেছেন:

তোমরা মিথ্যা পরিহার কর। কেননা মিথ্যা পাপাচারের দিকে নিয়ে যায়, আর পাপাচার জাহান্নামের দিকে ধাবিত করে। কোনো লোক সর্বদা মিথ্যা কথা বলতে থাকলে ও এতে প্রচেষ্টা চালাতে থাকলে তার নাম আল্লাহ তা‘আলার কাছে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়ে যায়।---বুখারী: ৬০৯৪; মুসলিম: ২৬০৭

গীবত থেকে বেঁচে থাকা

গীবত হচ্ছে, কোনো মুসলিম ভাইয়ের অগোচরে তার ব্যাপারে এমন আলোচনা করা, যা সে অপছন্দ করে। চাই এটা তার শারীরিক ত্রুটি-বিচ্যুতিই হোক না কেন। যেমন কাউকে নিন্দা ও দোষারোপ করার উদ্দেশ্যে ল্যাংড়া, ট্যারা বা অন্ধ বলা। তেমনি কারো চারিত্রিক ত্রুটি তুলে ধরা যা সে অপছন্দ করে, যেমন বোকা, নির্বোধ, ফাসেক ইত্যাদি। বাস্তবে ওই লোকের মধ্যে এ সকল দোষ-ত্রুটি বিদ্যমান থাকুক বা না থাকুক।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গীবত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন:

‘এটা হলো তোমার ভাই সম্পর্কে এমন আলোচনা করা যা সে অপছন্দ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো, আমি যা বলি তা যদি আমার ভাইয়ের মধ্যে থাকে তাহলে এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, তুমি যা বলো তা যদি তার মধ্যে থাকে তাহলে তুমি গীবত করলে, আর যদি না থাকে তাহলে তুমি তাকে অপবাদ দিলে।’ ---মুসলিম: ২৫৮৯

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে গীবত করতে নিষেধ করেছেন ও একে নিকৃষ্ট বস্তু তথা আপন মৃত ভাইয়ের গোস্ত খাওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

* আল্লাহ তা‘আলা বলেন:

‘আর তোমরা কারো গীবত করো না, তোমাদের কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা এটাকে ঘৃণাই কর।’ ---সূরা আল-হুজুরাত: ১২

অনুরূপভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানিয়েছেন যে, ‘তিনি মেরাজের রাত্রে কোনো এক সম্প্রদায়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যাদের পিতলের নখ রয়েছে তারা এগুলো দিয়ে তাদের মুখমণ্ডল ও বক্ষে আঘাত করছে। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে জিব্রাইল এরা কারা? জিব্রাঈল উত্তরে বললেন, এরা ওই সমস্ত লোক যারা পৃথিবীতে মানুষের গোশত খেতো (গীবত করত) এবং মানুষের সম্মানহানি ঘটাতো।’--- আবু দাউদ: ৪৮৭৮; মুসনাদে আহমাদ ৩/২২৪

চুগলখোরি থেকে বেঁচে থাকা

চুগলখোরী হচ্ছে, পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্টের উদ্দেশ্যে এক ব্যক্তির কথা আরেকজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া।। এটি অন্যতম কবিরা গুনাহ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে বলেন: ‘চুগলখোর জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’[মুসলিম: ১০৫]

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,

‘নবী সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা দুটি কবরের পাশে দিয়ে অতিক্রম করলেন। তারপর বললেন, দুটো কবরবাসীকে আযাব দেয়া হচ্ছে। অবশ্য বিরাট কোনো কঠিন কাজের জন্য তাদের শাস্তি হচ্ছে না। (অর্থাৎ যা থেকে বেঁচে থাকা কোনো কঠিন বিষয় ছিল না) তাদের একজন প্রস্রাব করে পবিত্রতা অর্জন করতো না। অপরজন মানুষের মধ্যে চুগলখোরি করে বেড়াত।’[বুখারী: ১৩৭৮; মুসলিম: ২৯২]

বস্তুত: নামীমা বা চুগলখোরি ব্যক্তি, সমাজ ও মুসলিমদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করা এবং তাদের মধ্যে শত্রুতার আগুন লাগিয়ে দেওয়া।

﴿‘আর তুমি আনুগত্য করো না প্রত্যেক এমন ব্যক্তির যে অধিক কসমকারী, লাঞ্ছিত। পিছনে নিন্দাকারী ও যে চুগলখোরী করে বেড়ায়।’ --সূরা আল-কালাম, আয়াত: ১০-১১

সুতরাং যে আপনার কাছে অপরের নিন্দা ও চুগলখোরি করে সে আপনার ব্যাপারেও চুগলখোরি করে বেড়ায়। সুতরাং তার থেকে সতর্ক থাকুন।

লেখাটি বড় হয়ে যাওয়ার কারণে আজ এখানে শেষ করছি। ইনশা’আল্লাহ, পরবর্তী পোস্টে সিয়াম পালনকারীর জন্য আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ বর্জনীয় কাজ নিয়ে আলোচনা করা হবে।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে সিয়াম পালন করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সিয়াম কবুল করুন। আমীন।